করোনা ভাইরাসের উৎস নিয়ে চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার দ্বন্দ্ব

প্রকাশিত: মে ২, ২০২০

আন্তজার্তিক ডেস্ক:

করোনাভাইরাস ছড়াতে শুরু করে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে। কিন্তু এই ভাইরাসের উৎস নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মতো অস্ট্রেলিয়ায়ও দ্বিমত দেখা দেয়। চীন যদিও আগেই বলেছে, বন্য প্রাণীর বাজার থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। তবু কয়েকজন বিজ্ঞানী দাবি করেন, ‘দুর্ঘটনার’ ফলে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে চীনের গবেষণাগার থেকে। এই পরিস্থিতিতে মূল উৎসের স্বচ্ছ উত্তর দেওয়ার দাবি করেন অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন। আর তাতেই চটে যায় চীন। হুমকি দেয় ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার। শুরু হয় দুই দেশের বাকযুদ্ধ।

পিটার ডাটন কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ। দীর্ঘদিন শুধু রাজনীতি করছেন এমন নয়। ২০০১ সাল থেকে কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের ডিক্সন থেকে নিয়মিত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ক্ষমতায়ও আছেন অনেক দিন ধরে। কিন্তু দল ও দলের বাইরে তিনি একজন কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ। তিনি আলোচনার পাদপ্রদীপে আসেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো বিভিন্ন কট্টর মন্তব্যের জন্য।

অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এ দাবির মধ্যে ডাটনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কারণ, তিনি বরাবরই দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদটি পেতে আগ্রহী। ফলে এই দাবির বিপক্ষে চীনা কর্তৃপক্ষ যেভাবে অস্ট্রেলিয়াকে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করছে, তারপরও সরকার ধীরে পায়ে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য দেশটির সচেতন মানুষের।দেশটির রাজধানী ক্যানবেরাতে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘কিছু অস্ট্রেলীয় রাজনীতিবিদ আছেন, তাঁরা আমেরিকার তোতা পাখি।’ তারপর ডাটনকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাউথপিস’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় চীন। অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত চেং জিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার একটি সংবাদপত্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তদন্তের কথা বেশি বললে বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন, কৃষিক্ষেত্রে লেনদেন চীন বর্জন শুরু করবে। গরুর মাংস আমদানি বন্ধ করে দেবে।

অস্ট্রেলিয়ার এক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বেইজিং-ওয়াশিংটন আলাদা হিসাব। তারা একে অপরকে প্রায়ই দোষারোপ করে। তাই বলে অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি মধ্যশক্তির দেশের দাবি চীন গ্রাহ্য করবে না। এ জন্য চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোও অস্ট্রেলিয়াকে এক হাত নিচ্ছে। কোনো কোনো চীনা সংবাদমাধ্যম অস্ট্রেলিয়ার প্রতি চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক বক্তব্যও প্রকাশ করছে।

এদিকে চীনে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম রাষ্ট্রদূত স্টিফেন ফিজজেরাল্ড সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া যেন কোভিড-১৯-এর এই ‘ব্লেম গেমে’ না জড়ায়।নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের দীর্ঘকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বব কার ‘আমরা আবার চীনের সঙ্গে অপেশাদার কূটনৈতিকতা দেখালাম’ শিরোনামে আজ এক মতামত নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি নিবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক একটি সম্পর্ক রয়েছে চীনের সঙ্গে। আমরা বলছি না ইস্যুটি বাদ দেওয়া হোক। উন্মুক্ত তদন্ত চীনের স্বার্থেই হওয়া দরকার। তবে একটু সময় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে এবং প্রাথমিকভাবে সংবাদমাধ্যমের বাইরে।’

আজ অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রদূতের কাছে তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে তিনি এই তদন্তের বিষয়টি তুলবেন। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রদানকারী পরিষদ।অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুমাত্রিক। চীন অস্ট্রেলিয়ার এক নম্বর রপ্তানি বাজার। ৯০ শতাংশ পণ্যদ্রব্য আসে চীন থেকে। ২০১৮ সালে চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বাণিজ্য হয়েছে প্রায় ২১৫ বিলিয়ন ডলারের। ২০১৮-১৯ সালে ১৪ লাখ চীনা পর্যটক অস্ট্রেলিয়ায় ঘুরতে আসে।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এরপর এটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। চীনের একটি পশুর বাজারে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। আজ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩১ লাখের বেশি মানুষ এ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন এবং ২ লাখ ৩৭ হাজার মানুষ মারা গেছেন।

চীনে এই ভাইরাসের সংক্রমণের শুরু থেকেই এর উৎপত্তি ও বিস্তার নিয়ে তদন্তের দাবি ওঠে। অনেকের যুক্তি ছিল, এ–সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন দেশকে এ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সহায়তা করবে। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চীনের বিরুদ্ধে ভাইরাস নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় চীনকে অভিযুক্ত করেছেন।(সুত্র:রয়র্টাস)